প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের পরিবর্তন



নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ খড়িবাড়ি গ্রামের মসজিদপাড়ার দোয়েল জনসংগঠনের এনিমেটর মোছাঃ শিল্পী বেগম (২৬) স্বামীঃ দেলোয়ার হোসেন (৩৫)।
তিনি অতি সাধারন ঘরের কিন্তু খুব সাহসী এবং পরিশ্রমী। ১০ম শ্রেনী র্পযন্ত পড়ালেখা চলাকালে তার বিয়ে হয়। তার স্বামী একজন সাধারন ব্যবসায়ী একসময় তার স্বামীর ব্যবসা ভাল চলছিল, হাতে অনেক পুঁজি ছিল। তিনি তার স্বামীর ব্যবসার কাজে সহযোগীতা করতেন হিসাব নিকাশ করে দিতেন।
সুখেই কাটছিল তার সংসার ,হঠাৎ করে তার স্বামীর ব্যবসার ক্ষতি হয় এবং পুঁজি নষ্ট হয়ে যায়। তারপর জীবন চলার তাগিদে কাজের সন্ধানে সিলেটে চলে যান তার স্বামী। তারপর থেকে শিল্পী বেগমকে সংসারের হাল ধরতে হয়। তিনি তখন ছোট বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়াতেন, হাঁস মুরগী পালন করতেন। ১ বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে ভূট্রা চাষ করেন, এভাবেই তার সংসার চলতে থাকে।
২০১০ সাল থেকে পল্লীশ্রী রিকল প্রকল্প কাজ করে। শিল্পী বেগম দোয়েল জনসংগঠনে নারী ওয়াস দলের একজন কার্যকরী সদস্য। তিনি পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে দক্ষিন খড়িবাড়ি গ্রামে প্রতীক প্রকল্পের কাজ আরম্ভ হলে তখন শিল্পী বেগম কৃষি কাজের সাথে জড়িত থাকার কারনে এনিমেটর হিসেবে গন গবেষনায় কাজ করার সুযোগ পান। প্রতীক প্রকল্পে এনিমেটর হয়ে তিনি একটি স্মার্টফোন হাতে পান। তারপর ফোনটি কিভাবে ব্যবহার করবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষন পান এবং দক্ষতার সাথে ফোনটি ব্যবহার শুরু করেন। তথ্য প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হয়ে শিল্পী বেগম কৃষি কাজে আরও জোর দেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে যে এসএমএস পান তা কৃষি কাজে এবং ব্যাক্তি জীবনে কাজে লাগান। কৃষি কাজ করতে গিয়ে যে সমস্যায় পড়তেন রোগব্যাধি হতো সে সব বিষয়ে তিনি প্রতীক কল সেন্টার থেকে পরামর্শ নিতেন এবং দ্রুত সমাধান করতেন। এছাড়াও ভূট্টা চাষ করার সময় তিনি নিজে ভূট্টা অ্যাপস্ ব্যবহার করেন এবং প্রতিবেশিদের পরামর্শ দেন। এছাড়াও কৃষকের জানালা ,গরু পালন,ছাগল পালন, গুগল, ইউটিউব ব্যবহার করেন। তিনি বসত ভিটায় সবজি চাষ করেছেন, গরু ছাগল, হাঁস-মুরগী পালন করছেন। সমস্যা হলে পরামর্শ নিয়ে সমাধান করছেন। এতে করে তিনি ভাল ফল পাচ্ছেন এবং উপকৃত হচ্ছেন। এ বছরে তিনি ১ বিঘা জমিতে প্রতীক ভূট্টা অ্যাপস্্ ব্যবহার করে ভূট্রা চাষ করেছেন এবং ফলন হিসেবে ৩৮ মন ভূট্টা ্ পেয়েছেন যা গত বছরের তুলনায় ২মন বেশি ফলন হয়েছে। তার ভূট্রার জমিতে কাটুই পোকা দেখা দিলে সাথে সাথে অ্যাপস ্ ব্যবহার করে কাটুই পোকা দমন করেন, হাঁসের চাকুলা রোগ হলে প্রতীক কল সেন্টারের পরামর্শ নেন এবং ৩ দিনের মধ্যে চাকুলা রোগ ভাল হয়ে যায়। এছাড়াও এসএমএস পেয়ে তিনি নিজে এবং প্রতিবেশির ছাগলের পিপিআর রোগের ভ্যাকসিন এবং গরুর ক্ষুরা রোগের ভ্যাকসিন দেন। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবজি চাষ করেন, মাটির গর্তে ২ হাত নীচে পলিথিন দিয়ে জৈব সার মাটি দিয়ে ভরাট করে মিষ্টি কুমড়া চাষ করেন। এতে করে বালু মাটিতে পানি আটকে থাকে এবং সবজি ভাল হয়। এভাবে মিষ্টি কুমড়া চাষ করে তিনি ১২০০ টাকায় বিক্রি করেন।
বর্তমানে শিল্পী বেগমের তার গ্রামে গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে, তার গ্রামে কেউ কৃষি বিষয়ক কোন সমস্যায় পরলে তার নিকট সহযোগীতা চান এবং তিনি পরামর্শ দিতে তাদের সহযোগীতা করেন এছাড়াও উপজেলা র্পযায়ে কৃষি সম্প্রসারন অফিস , প্রাণীসম্পদ অফিস ,মৎস্য অফিস ,সমাজ সেবা অফিস, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার এবং ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত যোগাযোগ করে পরামর্শ নিয়ে থাকেন, তিনি তার গ্রামের ২ জনকে মাতৃত্বকালীন ভাতা সুবিধা পেতে সহযোগীতা করেছেন। বর্তমানে প্রতিবেশীরা কৃষি বিষয়ে সমস্যায় পড়লে তার কাছে আসেন এবং পরামর্শ নিয়ে থাকেন। শিল্পি বেগমের পরিবারে আগের তুলনায় অনেকটা আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। বর্তমানে তিনি তার নিজের নামে গ্রামীন ব্যাংকে ৫০০ টাকার একটি ডিপিএস করেছেন এছাড়াও দোয়েল জনসংগঠনে ২০০০ টাকার সঞ্চয় আছে। বর্তমানের তিনি নিজেই নিজের খরচ চালান এবং সন্তানের লেখাপড়ার খরচ সহ টিফিনের টাকা দিতে পারেন।
পরিশেষে শিল্পী বেগম এক কথায় নিজের পরিবর্তন সম্পর্কে বলেন, “আমার স্বপ্ন আমাদের গ্রামটি একটি ডিজিটাল গ্রাম হবে এবং আমাদের মাধ্যমে অনেক বেশি মানুষের কাছে তথ্য পৌছাবে, সেই তথ্য পেয়ে মানুষ উপকৃত হবে”। তিনি আরও বলেন, “তথ্য আমাকে বদলে দিয়েছে আর আমি পরিশ্রম দিয়ে নিজের ভাগ্যকে বদলানোর চেষ্টা করছি”।

Share

Leave a Reply